
তাওহীদুর রহমান শাহ্
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও তথ্য-প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার জীবনযাপনে নিয়ে এসেছে পরিবর্তন। আধুনিক যুগের ছোঁয়াতে জীবন বদলে দেওয়ার এই জাদুর কাঠির সঙ্গে হারিয়ে গেছে জীবন ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা অনেক জিনিসপত্র। আশি বা নব্বই দশকে যে যন্ত্রগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, একবিংশ শতাব্দীতে সবই এখন কালের গর্ভে বিলীন।
একদিকে দেশের আধুনিকতায় পরিবর্তন অন্যদিকে হারিয়ে ফেলা দেশের ও সভ্যতার ইতিহাস। এখন আর রেডিও নিয়ে কেউ খবর শোনার অপেক্ষায় থাকে না, সন্ধ্যা হতেই গ্রামে গ্রামে হারিকেন জ্বলে না, ঢেঁকির শব্দে মুখরিত হয় না হেমন্তের ধান ভানার উৎসব, লাঙ্গল নিয়ে পরিবারের কেউ মাঠে যায় না, পানীয় পান করার জন্য রূপা বা তামার পাত্র ব্যবহার করে না ও কাসার থালায় ভাত খেতেও দেখা যায় না।
তবে প্রাচীনকালের ঐতিহ্যের নিদর্শন আধুনিক যুগের সাক্ষী হিসেবে নিজের শখের জন্য এগুলো সংগ্রহ করে রেখেছেন সিলেটের জিবলু রহমান।
নগরের দাড়িয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত শ্রীহট্ট প্রকাশের বইমেলার পাশাপাশি বাঙালি ঐতিহ্যের বিশাল এক সংগ্রহশালার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন তিনি।
প্রায় দেড় থেকে ২০০ ধরনের প্রাচীনকালের ঐতিহ্যবাহী মানুষের ব্যবহারিক বিভিন্ন জিনিসপত্র রয়েছে তার সংগ্রহশালায় যা প্রথমে দেখলে ছোট একটি জাদুঘর মনে হতে পারে।
সেখানেই রাখা আছে শত বছরের পুরোনো পিতলের লোটা, অর্ধশত বছর আগের রেডিও, পালকি, পায়ের খড়ম, মাটির পাতিল, পিঠা তৈরির সরঞ্জাম, মাটির চুলো, সুপারি কাটার যাঁতি, হারিকেন, বিউগল, কয়লার ইস্ত্রি, হুঁকো, মাটির পুতুল, পুরনো টাইপ রাইটার মেশিন, গ্রামোফোন, রাজকীয় খুরমার বাটি, হাসন রাজার পঙ্খীরাজসহ আরও কত কী।
কৃষি প্রধান বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কৃষিজ সরঞ্জাম স্থান পেয়েছে তার সংগ্রহশালায়। রয়েছে মাছ ধরার ডরি, ঠেলাজাল, কোকা, পলোসহ নানা উপাদান৷ এছাড়াও বাঁশ-বেতের তৈরি খলুই, ঝাঁপি, চাইন, টুকরি আর কৃষকের মাথান যেন স্মরণ করিয়ে দেয় শত বছরের বাঙালিয়ানার চিরচেনা রূপ।
সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে মানুষ যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। এই যান্ত্রিকতার কারণে হারাতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানান জিনিস।
আগামী প্রজন্ম যা দেখবে তার পরের প্রজন্ম হয়তো তাদের থেকেও উন্নত কিছু দেখবে। কিন্তু এগুলো সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করে আগামীর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে জিবলু রহমানের এই মহৎ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।